পার্বত্য আলো
সারাদেশ প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ৫:৫৮ পূর্বাহ্ন || প্রিন্ট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫:৪২ পূর্বাহ্ন স্টাফ রিপোর্টার

রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়ক আধুনিকায়নে ১৯৫ কোটি টাকা

রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়ক আধুনিকায়নে ১৯৫ কোটি টাকা
শামীম ইকবাল চৌধুরী, নাইক্ষ্যংছড়ি(বান্দরবান)থেকে::
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আধুনিকায়নের পথে এগোচ্ছে কক্সবাজারের রামু থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপজেলার সড়কটি । বান্দরবান সড়ক বিভাগের অধীনে ‘হোস্ট কমিউনিটির’ সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১১ দশমিক ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়ক (জেড-১০০১) নির্মাণ ও উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে ১৯৫ কোটি টাকা। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পর এখন মাঠপর্যায়ে নির্মাণকাজ শুরুর প্রস্তুতি চলছে।
এরই অংশ হিসেবে গেল মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) প্রকল্প এলাকায় উচ্চপর্যায়ের চূড়ান্ত পরিবেশগত সমীক্ষা চালানো হয়েছে।
পাহাড়ের স্থায়িত্ব বনভূমি ঝিরি-ছড়া পানি নিষ্কাশন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সমীক্ষায় নির্মাণকাজের পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা আরও চূড়ান্ত করা হয়।
সওজ সূত্রে জানা গেছে, রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কটি নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের আরাকান সড়কের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান পথ সড়কটির বর্তমান অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে।
স্থানীয় বাসিন্দা ব্যবসায়ী কৃষক ও সীমান্ত এলাকার মানুষের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে আছে। প্রকল্পের আওতায় সড়কটি আধুনিকায়ন হলে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
১৯৫ কোটি টাকার কাজ পেল ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সঃ
চলতি বছরের ২৪ জুন সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়নকাজে ১৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দেয়। উন্মুক্ত দরপত্রে অংশ নেওয়া তিনটি প্রতিষ্ঠানের দরপত্র কারিগরিভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার পর দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সর্বনিম্ন দরদাতা ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকে কাজটি দেওয়া হয়।
সরকারি ই-জিপি নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে ২১ জুলাই ২০২৬ চুক্তিমূল্য ১৯৫ কোটি টাকা এবং প্রস্তাবিত কাজ শুরুর তারিখ ২ আগস্ট ২০২৬ চুক্তিতে কাজ শেষ করার সময়সীমা ২৫ জুন ২০২৮ নির্ধারণ করা হয়েছে।
কী থাকছে প্রকল্পে! এই নিয়ে সুত্রে জানাযায়,
প্রকল্পের আওতায় ৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি মাটির কাজ ৩ দশমিক ৮১ কিলোমিটার সড়ক মজবুতকরণ ও প্রশস্তকরণ ১ দশমিক ৫০ কিলোমিটার রিজিড পেভমেন্ট এবং ৮ দশমিক ৪১ কিলোমিটার সড়কে ডিবিএস সার্ফেসিং করা হবে।
এছাড়া নির্মাণ করা হবে তিনটি সেতু ও ৪১টি কালভার্ট। পাহাড়ি ঢল ও বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য আরসিসি সসার ড্রেন ও ইউ-ড্রেন, পাহাড়ের ঢাল সুরক্ষায় স্লোপ প্রটেকশন, রিটেইনিং ওয়াল এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন আধুনিক অবকাঠামো যুক্ত করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন পাহাড়ি এলাকায় শুধু সড়ক প্রশস্ত করলেই হবে না। বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল অতিবৃষ্টি ও ভূমিধসের চাপ সামাল দেওয়ার মতো অবকাঠামোও থাকতে হবে। এ কারণে প্রকল্পের নকশায় পানি নিষ্কাশন ও পাহাড়ের ঢাল সুরক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পাহাড় কাটার ঝুঁকি, পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ নজর রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা পাহাড়, বনভূমি ও ঝিরি-ছড়ায় ঘেরা। ফলে সড়ক উন্নয়ন করতে গিয়ে পাহাড়ের স্থায়িত্ব নষ্ট হলে বর্ষাকালে ভূমিধস ও আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি বাড়তে পারে। মঙ্গলবারের পরিবেশগত সমীক্ষায় এ বিষয়টিই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
সড়ক প্রশস্ত করার সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত পাহাড় কাটা, গাছপালা নষ্ট করা কিংবা প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এড়াতে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা অনুসরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। রামুর ঐতিহ্যবাহী রাবার বাগান, প্রাকৃতিক বন, বন্যপ্রাণী ও পাখির আবাসস্থল রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি সড়ক নির্মাণে প্রকল্পের ব্যয়ের পাশাপাশি পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিকভাবে ঢাল সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত কালভার্ট-ড্রেন নির্মাণ এবং ঝিরি-ছড়ার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বজায় রাখা গেলে সড়কটি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও কমানো সম্ভব।
সীমান্ত নিরাপত্তাতেও বাড়বে সক্ষমতাঃ
সড়কটির গুরুত্ব শুধু জনসাধারণের যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তঘেঁষা এলাকা হওয়ায় সীমান্তরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, দুর্গম এলাকায় সরকারি-বেসরকারি সেবা পৌঁছানো এবং জরুরি সময়ে রসদ পরিবহনের ক্ষেত্রেও এ সড়কের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে সড়কের অনেক অংশ সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় পাহাড়ি বাঁকগুলোতে যান চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বর্ষায় সড়কের বিভিন্ন অংশে পানি জমা, মাটি ধসে পড়া ও যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। আধুনিকায়নের ফলে এসব ঝুঁকি কমার পাশাপাশি যাতায়াতের সময়ও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে সম্ভাবনার নতুন দুয়ারঃ
নাইক্ষ্যংছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য রাবার চা তামাক ও জুমের ফসল বাজারজাত করতে পরিবহন ব্যয় ও সময় দুটিই বড় বিষয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, সড়কটি প্রশস্ত ও টেকসই হলে এসব পণ্য দ্রুত রামু হয়ে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে নেওয়া সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে পর্যটন সম্ভাবনাময় পাহাড়িঃ
এলাকাগুলোর সঙ্গে কক্সবাজারের যোগাযোগ বাড়বে। এতে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিবহন কৃষি বিপণন পর্যটন ও সেবা খাতে নতুন র্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বৃহৎ কর্মসূচি রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন Host and Rohingya Enhancement of Lives Project (HELP)-এর আওতায় বান্দরবান সড়ক বিভাগের তিনটি সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়ন কর্মসূচির একটি। প্রকল্পটির লক্ষ্য হোস্ট কমিউনিটি ও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মৌলিক সেবা যোগাযোগ এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো উন্নত করা।
সওজের নথিতে বলা হয়েছে, রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কটির দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ১৬৫ কিলোমিটার এবং এটি নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ।
প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদন পায় ২০২৪ সালের ২৮ মে। এর নির্ধারিত বাস্তবায়নকাল ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ছিল। পরবর্তী দরপত্র ও চুক্তি প্রক্রিয়ায় রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কের নির্দিষ্ট কাজের চুক্তি ২০২৬ সালে সম্পন্ন হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা শুধু সড়ক নয়, টেকসই উন্নয়নঃ
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের পর সড়কটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ তাদের জন্য বড় আশার খবর। তবে নির্মাণকাজের সময় যাতে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, অতিরিক্ত পাহাড় কাটা অপরিকল্পিত মাটি ফেলা কিংবা প্রাকৃতিক ছড়া-ঝিরির পানিপ্রবাহ বন্ধ না হয় সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের আশা, নির্ধারিত নকশা ও পরিবেশগত নির্দেশনা মেনে কাজ শেষ হলে রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কটি শুধু একটি উন্নত যোগাযোগপথ হবে না; এটি কক্সবাজারের পর্যটন অর্থনীতি, নাইক্ষ্যংছড়ির কৃষি ও সীমান্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং পাহাড়ি এলাকার জনজীবনের মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করবে।
সব মিলিয়ে ১৯৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পকে ঘিরে রামু ও নাইক্ষ্যংছড়িতে এখন নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। পরিবেশ রক্ষা ও প্রকৌশলগত মান নিশ্চিত করে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা গেলে দীর্ঘদিনের সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়কটি ভবিষ্যতে পাহাড়ি জনপদের একটি নিরাপদ ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোরে পরিণত হতে পারে।
সম্পাদক : প্রিয়দর্শী বড়ুয়া ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নুসরাত জাহান আইন সম্পাদক : এডভোকেট ইব্রাহিম বার্তা সম্পাদক : এম. জাহিদ হাসান
প্রধান সড়ক, মৌচাক কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেডের পাশে, লামা, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।  ·  মোবাইল : ০১৮৮৯-৩৮৪৮০১  ·  ই-মেইল : parbattaalonews@gmail.com
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ Parbatta Alo-পার্বত্য আলো
PDF চাইলে প্রিন্ট উইন্ডোতে Destination → “Save as PDF”, Layout → Landscape, Margins → None।  |  ফটো কার্ড = ফেসবুকের জন্য ১০৮০×১০৮০ কার্ড।